জুলাই জাদুঘর থেকে সীমান্ত হত্যা, ফেলানী হত্যাকাণ্ড এবং মোদিবিরোধী আন্দোলনের স্মৃতি-সংবলিত বিভিন্ন উপাদান সরিয়ে ফেলার ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। শনিবার (৮ আগস্ট) জুলাই জাদুঘর পরিদর্শন শেষে আয়োজিত এক সংক্ষিপ্ত প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি সাংবাদিকদের সামনে এ ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
নাহিদ ইসলাম বলেন, “জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসকে কোনোভাবেই দলীয় বয়ানের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা উচিত নয়। এর পাশাপাশি জাদুঘরে জুলাই আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়, ঢাকার বাইরের আন্দোলন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদরাসাশিক্ষার্থীদের ভূমিকা এবং শহিদদের অবদান আরও বিস্তৃতভাবে তুলে ধরার প্রয়োজন রয়েছে।”
“ইতিহাসের অংশ হলে সেটি কেন থাকবে না? গত ১৬ বছরে বাংলাদেশের যৌথ ফ্যাসিবাদের সঙ্গে ভারতের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পর্কের বিষয়টিও ইতিহাসেরই অংশ।”
— নাহিদ ইসলাম, আহ্বায়ক, এনসিপি
ইতিহাসকে ‘দলীয় বয়ান’ থেকে মুক্ত রাখার আহ্বান
পরিদর্শনে বেশ কিছু পরিবর্তন চোখে পড়েছে জানিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, ভারতীয় বিএসএফের হাতে নিহত বাংলাদেশিদের একটি তালিকা এবং ফেলানী হত্যাকাণ্ডের স্মরণে রাখা ভাস্কর্যসহ মোদিবিরোধী আন্দোলনের চিত্রগুলো সেখান থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে।
তিনি অভিযোগ করেন, পুরো জাদুঘর ঘুরে মনে হতে পারে গত ১৬ বছরের শাসনব্যবস্থা কেবল দেশীয় বিষয় ছিল, অথচ এর পেছনে বৈরিতা ও বৈদেশিক শক্তির প্রত্যক্ষ ভূমিকা জড়িয়ে আছে। ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে তিনি বলেন, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ভালো বা খারাপের চেয়ে বড় বিষয় হলো তা মর্যাদাপূর্ণ ও সমতার ভিত্তিতে হওয়া উচিত। কিন্তু ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করতে গিয়ে সরকার বিভিন্ন বিষয়ে আপস করছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
এছাড়া বিএনপি নেতাকর্মীদের ওপর নির্যাতনের তথ্য বৃদ্ধি পেলেও তাতে কিছুটা দলীয় বয়ান যুক্ত হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু গণভবন থেকে চালানো রাষ্ট্রীয় অপকর্ম ও লুটপাটের চিত্র বস্তুর মাধ্যমে আরও নিরপেক্ষভাবে ফুটিয়ে তোলার ওপর জোর দেন তিনি।
জুলাই জাদুঘর সম্পর্কিত প্রধান পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশসমূহ
নাহিদ ইসলাম জাদুঘরের বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি ও পর্যবেক্ষণ উপস্থাপন করেন:
- আঞ্চলিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বৈচিত্র্য নিশ্চিতকরণ: আন্দোলন শুধু চেনা মুখ বা নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলে সীমাবদ্ধ ছিল না। ঢাকার বাইরের জেলা, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদরাসাশিক্ষার্থীদের অবদান আলাদাভাবে প্রদর্শন করতে হবে।
- শহিদ আবু সাঈদসহ সকল শহিদের স্মৃতি: গণঅভ্যুত্থানের স্ফুলিঙ্গ শহিদ আবু সাঈদের ছবি গ্যালারিতে না থাকা নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন। একইসঙ্গে শহিদ পরিবারের দেওয়া প্রচুর স্মৃতিচিহ্নগুলো শৈল্পিকভাবে প্রদর্শনের তাগিদ দেন।
- পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগ: বর্তমানে মাত্র ১৫–২০ জন কর্মী ও সেচ্ছাসেবক দিয়ে জাদুঘর পরিচালিত হচ্ছে। বিপুল দর্শনার্থীর চাপ সামলাতে ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে অন্তত ২০০ জন প্রশিক্ষিত জনবল প্রয়োজন।
- স্বায়ত্তশাসিত পরিচালনা কাঠামো: আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এড়িয়ে জুলাই আন্দোলনের চেতনা ধারণকারী গবেষক, বিশেষজ্ঞ ও সম্পৃক্ত শিক্ষার্থীদের নিয়ে একটি স্বায়ত্তশাসিত পর্ষদ গঠনের দাবি জানান।
- আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার: আন্তর্জাতিক মানদণ্ড (যেমন চীনের জাদুঘরের অভিজ্ঞতা) অনুসরণ করে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ‘এক্সপ্লেইনার’ এবং অডিও গাইড চালুর প্রস্তাব করা হয়।
এক নজরে সংবাদটি
|
বিষয় |
বিবরণ |
|---|---|
|
বক্তা |
নাহিদ ইসলাম (আহ্বায়ক, এনসিপি ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ) |
|
স্থান |
জুলাই জাদুঘর (সাবেক গণভবন), ঢাকা |
|
তারিখ |
শনিবার, ৮ আগস্ট ২০২৬ |
|
মূল অভিযোগ |
ফেলানী স্মারক, সীমান্ত হত্যা ও মোদিবিরোধী চিত্র অপসারণ এবং ইতিহাস দলীয়করণের চেষ্টা |
|
মূল দাবি |
স্বায়ত্তশাসিত পরিচালনা পরিষদ গঠন ও ২০০ জন দক্ষ জনবল নিয়োগ নাহিদ ইসলাম সতর্ক করে বলেন, অতীতে যেভাবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে বারবার দলীয়করণ করা হয়েছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ক্ষেত্রে যেন সেই ভুল না হয়। একে প্রকৃত ইতিহাসচর্চার জায়গা হিসেবে গড়ে তুলে একটি জাতীয় রূপ দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। |

0 Comments