বাংলাদেশের অর্থনৈতিক হৃদপিণ্ড চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) প্রতিষ্ঠান 'ডিপি ওয়ার্ল্ড'-এর কাছে ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে তীব্র বিতর্ক ও নিরাপত্তা উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। অর্থনৈতিক ক্ষতি, ভূ-রাজনৈতিক জটিলতা এবং জাতীয় সার্বভৌমত্বের বিষয়টি সামনে এনে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন বিভিন্ন বিশ্লেষক ও নাগরিক সমাজ।
বছরে ক্ষতি ৯২ মিলিয়ন ডলার: চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রতিবেদন
ক্রুডল অব গভর্ন্যান্স (মিডিয়া উইং)-এর বক্তব্য ও নিজস্ব হিসাবের পর্যালোচনায় দেখা যায়, ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে এনসিটি ইজারা দিলে বাংলাদেশের বছরে প্রায় ৯২ মিলিয়ন ডলার (প্রায় ১,১০০ কোটি টাকা) আর্থিক ক্ষতি হবে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের নিজস্ব প্রশাসনিক ও পরিচালন খরচ বাদ দিয়ে যেখানে এনসিটি টার্মিনাল পরিচালনায় বিপুল লাভ থাকে, সেখানে বিদেশি কোনো ডিপি ওয়ার্ল্ড প্রস্তাবিত রেট অনুযায়ী প্রতি কনটেইনারে চট্টগ্রাম বন্দরের স্বাভাবিক আয় কমাবে। বর্তমানে দেশীয় ব্যবস্থাপনার অধীনে যে টার্মিনাল আয় করছে, তা বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দিলে রাষ্ট্রের রাজস্বে ধস নামবে।
ভারতের স্বার্থ ও ভূ-রাজনৈতিক নিরাপত্তা ঝুঁকি
এনসিটি টার্মিনাল পরিচালনায় ভারতীয় নাগরিক বা ভারতের নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের যুক্ত করার প্রক্রিয়ায় বড় ধরণের সার্বভৌমত্বের ঝুঁকি দেখছেন বিশ্লেষকরা।
- ডিপি ওয়ার্ল্ডের ভারতীয় কর্মকর্তা ও সংযোগের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রধান বন্দরের তথ্য ও কৌশলগত অবকাঠামো ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা 'র' (RAW)-এর নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
- ক্যানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও আমেরিকার সাম্প্রতিক তদন্ত এবং আইনি নথিতে ভারতের প্রবাসী নেটওয়ার্ক ও গোয়েন্দা সংস্থার বিরুদ্ধে বিদেশে গোপন তৎপরতার যে অভিযোগ দেখা গেছে, তা বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা দাবি করে।
- বিশেষ করে চট্টগ্রাম থেকে ত্রিপুরা, মিজোরাম এবং ভারত-মিয়ানমার করিডোর নিয়ে ভারতীয় সংবাদ মাধ্যম ও কৌশলবিদদের যে তৎপরতা, তাতে চট্টগ্রাম বন্দর কোনো ভিন্ন রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে যাওয়া ঝুঁকি বাড়াবে।
আমিরাত, ইসরায়েল ও ডিপি ওয়ার্ল্ডের 'সামরিক ঘাঁটি' ট্র্যাক রেকর্ড
ডিপি ওয়ার্ল্ড কেবল একটি আন্তর্জাতিক বন্দর পরিচালনাকারী সংস্থা নয়; বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে এর সামরিক ব্যবহার সম্পর্কিত চাঞ্চল্যকর তথ্য।
- দ্বিমুখী ব্যবহার (Dual-Use): নেদারল্যান্ডসের ক্লিঙ্গেনডাল ইনস্টিটিউটের গবেষক আয়শে কোচাকের মতে, ডিপি ওয়ার্ল্ড বিদেশি বন্দর কনসেসনের পাশাপাশি আমিরাতের সামরিক স্বার্থে 'দ্বিমুখী' ঘাঁটি বা অবকাঠামো হিসেবে বন্দরগুলোকে ব্যবহার নিশ্চিত করে।
- সোমালিয়া ও ইয়েমেন অভিজ্ঞতা: সোমালিয়ার বোসাসো বন্দর এবং ইয়েমেনের এডেন ও সোকোত্রা দ্বীপে ডিপি ওয়ার্ল্ডের প্রবেশের পর সামরিক সুবিধা তৈরি এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীকে সহযোগিতার অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি এরিথ্রিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডিপি ওয়ার্ল্ডের এই "বন্দর সাম্রাজ্যবাদ" (Port Imperialism) এবং আমিরাত-ইসরায়েলের যৌথ সামরিক উপস্থিতির তীব্র বিরোধিতা করেছেন।
- ইসরায়েল সংযোগ: লোহিত সাগরে আমিরাত এবং ইসরায়েলের সামরিক কৌশলগত অংশীদারিত্বের তথ্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরে ইউএই-ভিত্তিক প্রতিষ্ঠানকে দ্বিমুখী সুবিধা দেওয়া হলে এর প্রভাব বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ও কূটনীতিতে পড়তে পারে।
আঞ্চলিক সংযোগ ও সার্বভৌমত্বের চক্রান্ত
মিজোরাম, ত্রিপুরা এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম ঘিরে আঞ্চলিক বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা এবং পার্বত্য চুক্তির বাস্তবায়নে অনিশ্চয়তার মধ্যে বন্দর টার্মিনালে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ দেশীয় নিরাপত্তাকে আরও ভঙ্গুর করবে। ভূ-কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ চট্টগ্রাম বন্দর হাতছাড়া হলে তা সার্বভৌমত্বের ওপর বড় ধরনের আঘাত হানতে পারে।
চূড়ান্ত মূল্যায়নে বিশেষজ্ঞ মত
এনসিটি ইতিমধ্যেই অত্যন্ত লাভজনক ও কার্যকরভাবে পরিচালিত হচ্ছে। লজিস্টিকস সামলানোর মতো দক্ষতা দেশীয় পরিকাঠামোতেই বিদ্যমান। ফলে যেখানে আর্থিক ক্ষতি নিশ্চিত এবং জাতীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর গভীর ছায়া পড়ার আশঙ্কা রয়েছে, সেখানে কোনো বিদেশি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর হাতে এই জাতীয় সম্পদ তুলে না দিয়ে দেশীয় ব্যবস্থাপনায় রাখা ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।



0 Comments