ইসলামী শরিয়তে আলেম ও শাসকের মধ্যকার সম্পর্ক এবং যার যার অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। আল-কুরআন ও হাদিসের আলোকে ইসলামী গবেষক ও প্রখ্যাত আলেমরা যুগে যুগে সতর্ক করে এসেছেন যে, দ্বীনের খেদমতে বা শাসককে সত্য পথ দেখানোর তাগিদ ছাড়া কেবল নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের জন্য কোনো আলেম যখন শাসকের দরবারে যাতায়াত শুরু করেন, তখন আল্লাহ তাআলা তাঁকে লাঞ্ছিত ও অপমানিত করেন।
অপরদিকে, রাষ্ট্রপ্রধান বা শাসক যদি নিজের অহংকার বিসর্জন দিয়ে দ্বীনের সহিহ এলেম এবং দোয়া-আশীর্বাদ লাভের আশায় বিনয়ের সাথে কোনো হক্কানী আলেমের দরবারে যান, তবে আল্লাহ তাআলা সেই শাসককে সম্মানিত করেন এবং তাঁর শাসনকাজে বরকত দান করেন।
ব্যক্তিগত স্বার্থে শাসকের দ্বারে আলেম: লাঞ্ছনার পথ
ইসলামের ইতিহাস ও ঐতিহ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, যেসকল আলেম পদমর্যাদা, অর্থবিত্ত বা ব্যক্তিগত সুবিধা লাভের আশায় দরবারি আলেমে পরিণত হয়েছেন, তারা শেষ পর্যন্ত জনগণ ও সৃষ্টিকর্তা—উভয়ের নিকটই গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছেন।
- হাদিসের সতর্কবার্তা: রাসূলে কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বহু হাদিসে সুলতান বা শাসকের দরবারে বিনা প্রয়োজনে যাতায়াতকারী আলেমদের ফিতনা সম্পর্কে সতর্ক করেছেন।
- আত্মমর্যাদা বিসর্জন: ব্যক্তিগত স্বার্থ যখন মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়, তখন আলেমদের মূল দায়িত্ব—অর্থাৎ 'সত্য কথা বলা' ও 'অন্যায়ের প্রতিবাদ করা' থমকে যায়। ফলে তারা কেবল দুনিয়াবি লাঞ্ছনাই পান না, বরং আল্লাহর দরবারেও জবাবদিহিতার মুখে পড়েন।
- বিনয় ও নসিহত গ্রহণ: রাজকীয় ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও যে শাসক আল্লাহর দরবারে নিজেকে ছোট মনে করে কোনো সহিহ আলেমের কাছে দোয়া ও পরামর্শের জন্য যান, আল্লাহ তাআলা তাঁর মর্যাদা বাড়িয়ে দেন।
- প্রজা সাধারণের আস্থা: আলেমদের সুপরামর্শে পরিচালিত শাসক জনগণের মাঝে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারেন, যার ফলে সমাজে শান্তি ও স্থিতিশীলতা আসে এবং ইতিহাসে তিনি অমর হয়ে থাকেন।
"সর্বোত্তম আলেম তিনি, যিনি শাসকের দরবার এড়িয়ে চলেন এবং নিজের আত্মমর্যাদা ও দ্বীনকে দুনিয়ার সম্পদের বিনিময়ে বিক্রি করেন না।"
আলেমদের সান্নিধ্যে বিনয়ী শাসক: সম্মানের শিখরে
ইসলামী ইতিহাসে যেসকল শাসক সফল ও ন্যায়পরায়ণ হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছেন—যেমন ওমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ), ওমর ইবনে আবদুল আজিজ (রঃ) কিংবা সুলতান সালাহুদ্দীন আইয়ুবী—তাদের বড় গুণ ছিল তারা দ্বীনের আলেমদের অত্যন্ত সম্মান করতেন।
উপসংহার
একটি সুন্দর ও সুশাসিত সমাজ গঠনের জন্য আলেমদের হতে হবে নিরপেক্ষ ও সত্যের প্রতীক, আর শাসকদের হতে হবে বিনয়ী ও হেদায়েতের অনুগামী। আলেমের কাজ শাসককে সত্যের পথ দেখানো, আর শাসকের কাজ সেই নসিহত গ্রহণ করা। ক্ষমতার মোহে আলেমের পতন যেমন সমাজের জন্য ক্ষতিকর, ঠিক তেমনি আলেমের নসিহত ও দোয়া বর্জনকারী শাসকের পরিণতিও শুভ হয় না।

0 Comments