দেশজুড়ে অব্যাহত দ্রব্যমূল্যের অনিয়ন্ত্রিত ঊর্ধ্বগতি, আইনি কাঠামোর শিথিলতা, ক্রমবর্ধমান সন্ত্রাস-চাঁদাবাজি এবং তীব্র বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের প্রতিবাদে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে ১৮ দফা জরুরি দাবি পেশ করেছে রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম 'ডেমোক্রেটিক বাংলাদেশ মুভমেন্ট (ডিবিএম)'। সম্প্রতি আয়োজিত এক বৃহৎ প্রতিবাদ সমাবেশ থেকে এই সুনির্দিষ্ট দাবিগুলো উত্থাপন করেন সংগঠনের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ।
বিজ্ঞপ্তি ও সমাবেশে উপস্থিত বক্তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দেশে এক অরাজক ও সংকটময় পরিস্থিতি বিরাজ করছে। চাল-ডাল, ভোজ্যতেল, রান্নার গ্যাস ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আকাশচুম্বী দামের কারণে সাধারণ ও খেটে খাওয়া মানুষ চরম দিশেহারা ও দিশেহারা অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে। একদিকে শিল্প-কারখানা ও বিদ্যুৎ-গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হয়ে উৎপাদন কমছে, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতির কষাঘাতে সাধারণ জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে।
দেশের এই সামগ্রিক অস্থিতিশীলতা নিরসন ও সাধারণ মানুষের মৌলিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সংগঠনের পক্ষ থেকে পেশ করা ১৮টি সুনির্দিষ্ট দাবি নিচে তুলে ধরা হলো:
১. সিন্ডিকেট বিলোপ ও মূল্য নিয়ন্ত্রণ: অনতিবিলম্বে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম কমাতে হবে এবং বাজার নিয়ন্ত্রণে অসাধু ব্যবসায়ী ও সিন্ডিকেট ভেঙে ফেলতে হবে।
২. আইনশৃঙ্খলা পুনর্প্রতিষ্ঠা: দেশজুড়ে চলা সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও অপরাধীদের তাৎক্ষণিক গ্রেফতার নিশ্চিত করে বিচারের আওতায় আনতে হবে।
৩. দুর্নীতি ও অর্থ পাচার রোধ: ব্যাংক ও শেয়ার মার্কেট কেলেঙ্কারির সঙ্গে যুক্ত দুর্নীতিবাজদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং দেশ থেকে পাচারকৃত অর্থ দ্রুত ফেরত আনতে হবে।
৪. নারী ও শিশু সুরক্ষা: ধর্ষণ, বলাৎকারসহ নারী ও শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে কঠোর ও জরুরি আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
৫. কর্মসংস্থান ও ভাতা: দেশে দ্রুত নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে এবং বেকার যুবক-যুবতীদের জন্য সরকারিভাবে 'বেকার ভাতা' চালু করতে হবে।
৬. শ্রমিকদের অধিকার ও বিমা: শ্রমিকের মজুরি জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সংগতি রেখে বাড়াতে হবে এবং যেকোনো দুর্ঘটনা বা বিমার সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।
৭. কৃষি ও কৃষকের স্বার্থরক্ষা: কৃষকের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য নির্ধারণ করতে হবে এবং কৃষি বিমা ও সার-বীজে পর্যাপ্ত ভর্তুকি দিতে হবে।
৮. সুদের বোঝা ও ঋণমুক্তি: ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নামে দরিদ্রদের ওপর চেপে বসা লুণ্ঠনমূলক সুদের বোঝা ও বেআইনি ঋণ চাপানো বন্ধ করতে হবে।
৯. জমি ও সম্পদের আইনি সুরক্ষায় জমি সিলিং: জমি সিলিং পুনর্নির্ধারণ করে অবৈধ দখলদারদের হাত থেকে জমি উদ্ধার করতে হবে।
১০. হাইকোর্টের আঞ্চলিক বেঞ্চ: সাধারণ মানুষের দোড়গোড়ায় বিচার পৌঁছে দিতে হাইকোর্টের আঞ্চলিক বেঞ্চ ও উপজেলা আদালত স্থাপন করতে হবে।
১১. গ্রাম আদালত শক্তিশালীকরণ: স্থানীয় পর্যায়ের বিবাদ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য গ্রাম আদালতকে স্বাধীন ও শক্তিশালী হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
১২. দক্ষতা ও ট্রেড প্রশিক্ষণ: তরুণ ও সাধারণ নাগরিকদের দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করতে নিয়মিত ট্রেড ও প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ সুবিধা দিতে হবে।
১৩. সমবায় ও গণতান্ত্রিক চর্চা: গ্রামে গ্রামে কৃষকদের সমবায় সমিতি গঠন করে গণতান্ত্রিক উপায়ে তা পরিচালনার সুযোগ ও সহায়তার ব্যবস্থা করতে হবে।
১৪. ইউনিয়ন পরিষদের ক্ষমতা বৃদ্ধি: ইউনিয়ন পরিষদকে সরাসরি ক্ষমতা ও প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ দিয়ে স্থানীয় সেবা সহজ করতে হবে।
১৫. সড়ক দুর্ঘটনা রোধ ও ক্ষতিপূরণ: সড়ক দুর্ঘটনা রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে এবং দুর্ঘটনায় নিহত ও আহতদের পরিবারের যথাযথ ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে হবে।
১৬. মৌলিক নাগরিক সুবিধা: শিক্ষা, চিকিৎসা ও প্রতিরক্ষা খাতের মান উন্নত করার পাশাপাশি অতি দরিদ্রদের জন্য বিনামূল্যে মৌলিক রেশনের ব্যবস্থা করতে হবে।
১৭. দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ ও প্রশাসনিক সংস্কার: দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ, আঞ্চলিক সরকার, স্বাধীন ও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন গঠন এবং অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে হবে।
১৮. বিনা মূল্যে জরুরি সেবা: অতি দরিদ্র ও সুবিধা বঞ্চিত পরিবারের জন্য বিনামূল্যে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানি সরবরাহের সুব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
সমাবেশের সমাপনী বক্তব্যে নেতৃবৃন্দ হুশিয়ারি দিয়ে বলেন, জনগণই দেশের প্রকৃত মালিক। সরকার যদি অবিলম্বে সাধারণ মানুষের আত্মচিৎকার না শোনে এবং এই গণদাবিগুলো বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়, তবে দেশজুড়ে সাধারণ মানুষকে সঙ্গে নিয়ে এক তীব্র গণআন্দোলন গড়ে তোলা হবে।

0 Comments