দীর্ঘ নির্যাতন, গুম, রিমান্ড ও কারাবাস পেরিয়ে দেশে ফিরে আবারো সক্রিয় রাজনীতিতে নামার ঘোষণা দিয়েছে 'বাংলাদেশ জনতা পার্টি' (বিজেপি)। একই সাথে রাষ্ট্রসংস্কার, আইনের শাসন, দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় ২১ দফা রাজনৈতিক রূপরেখা পেশ করেছে দলটি।
আজ জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে দলের প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট মিথুন চৌধুরী লিখিত বক্তব্যে এসব তথ্য জানান।
ভয়াবহ গুম ও রিমান্ডের স্মৃতিচারণ
সংবাদ সম্মেলনে মিথুন চৌধুরী তার ওপর ঘটে যাওয়া রাজনৈতিক নির্যাতনের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, ২০১৭ সালের ২৭ অক্টোবর সূত্রাপুর থেকে তাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। দীর্ঘ ১৮ দিন গুম থাকার পর তাকে গ্রেফতার দেখানো হয় এবং পরবর্তীতে দুই দফায় ৮ দিনের রিমান্ডে নিয়ে অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়। তিনি অভিযোগ করেন, তার রাজনৈতিক কার্যক্রম বন্ধ করতে দলীয় কার্যালয় সিলগালা করা হয় এবং তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহসহ বেশ কয়েকটি ভুয়া মামলা দায়ের করা হয়, যার ফলে তাকে দীর্ঘ ৫ বছর কারাগারে থাকতে হয়েছে।
তিনি বলেন, "৫ আগস্টের পর দেশে ফিরে আসার ইচ্ছা থাকলেও শারীরিক অসুস্থতার চিকিৎসা চলায় তা সম্ভব হয়নি। এখন দেশে ফিরে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে আমি আবারো রাজপথে সক্রিয় হয়েছি।"
প্রতিহিংসার রাজনীতি বন্ধের বার্তা
বিজেপি সভাপতি স্পষ্ট করে বলেন, "অতীতের কোনো অন্যায় বা নির্যাতনের প্রতিশোধ নিতে আমরা রাজনীতি করতে চাই না। আমরা এমন এক বাংলাদেশ চাই যেখানে কোনো রাজনৈতিক দলকে বেআইনিভাবে বন্ধ করা হবে না, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে এবং আইনের শাসন সবার জন্য সমান হবে। আমরা ক্ষমতার জন্য রাজনীতি করি না, মানুষের অধিকারের জন্য করি।"
বিজেপির ২১ দফা রাষ্ট্রসংস্কার রূপরেখা
সংবাদ সম্মেলনে একটি আধুনিক, বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে নিম্নলিখিত ২১ দফা প্রস্তাবনা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়:
- প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ: কোনো ব্যক্তি সর্বোচ্চ দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী পদে থাকতে পারবেন না—এমন সাংবিধানিক নিয়ম চালু করা।
- প্রতিহিংসার রাজনীতি বন্ধ: চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, রাজনৈতিক দখলদারিত্ব ও ভয়ের সংস্কৃতি বন্ধ করা।
- সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা: পৃথক মন্ত্রণালয় ও কমিশন গঠন এবং সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনায় বিশেষ বিচারিক ব্যবস্থার মাধ্যমে নিরপেক্ষ তদন্ত।
- প্রাদেশিক সরকারব্যবস্থা: ঢাকাভিত্তিক কেন্দ্রীভূত শাসনব্যবস্থার বদলে প্রদেশ গঠন করে ক্ষমতা ও প্রশাসনের বিকেন্দ্রীকরণ।
- শিক্ষা খাতে উন্নয়ন: কর্মমুখী ও কারিগরি শিক্ষার প্রসার, আধুনিক ল্যাব স্থাপন এবং আন্তর্জাতিক মানের উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করা।
- আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদ বাস্তবায়ন: গুম ও বিনাবিচারে হত্যা বন্ধে কার্যকর আইন ও আন্তর্জাতিক বিধান মেনে চলা।
- সামাজিক সমতা: ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণি বা পরিচয়ের ভিত্তিতে ভেদাভেদ না করে নাগরিক নিরাপত্তা ও সুশাসন নিশ্চিত করা।
- কালো আইন বাতিল: বাকস্বাধীনতা ও মৌলিক অধিকারবিরোধী যেকোনো কালো আইন সংশোধন বা বাতিল করা।
- কর্মসংস্থান সৃষ্টি: প্রতিটি পরিবারের অন্তত একজন সদস্যের জন্য চাকরির সুযোগ বা কর্মসংস্থানের উদ্যোগ নেওয়া।
- দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোরতা: সরকারি প্রতিষ্ঠান ও অর্থনীতিতে জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দুর্নীতি প্রতিরোধ করা।
- বিনামূল্যে ইন্টারনেট: শিক্ষার্থীদের শিক্ষাসংক্রান্ত কাজের সুবিধার্থে বিনামূল্যে বা ভর্তুকি মূল্যে ইন্টারনেট সরবরাহ করা।
- গবেষণায় বরাদ্দ বৃদ্ধি: বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে উদ্ভাবন ও গবেষণায় বড় অঙ্কের বাজেট বরাদ্দ।
- সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা: প্রতিটি নাগরিকের জন্য স্বাস্থ্যবীমা ব্যবস্থা চালু করা এবং সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে চিকিৎসার সুবিধা নিশ্চিত করা।
- শিক্ষিত বেকার ভাতা: নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য শিক্ষিত বেকারদের ভাতা প্রদান ও দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ প্রদান।
- মাতৃত্বকালীন ও পিতৃত্বকালীন ছুটি: কর্মজীবী নারীদের জন্য ৬ মাসের মাতৃত্বকালীন ছুটি এবং বাবাদের জন্য নির্দিষ্ট পিতৃত্বকালীন ছুটির নিয়ম চালু।
- সহজ শর্তে ঋণ ব্যবস্থা: তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যাংক থেকে ২ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা প্রদান।
- রেশন ব্যবস্থা চালুকরণ: নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যের সরকারি রেশন ব্যবস্থা গঠন।
- ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সহায়তা: খেলাপি ঋণ আদায়ে কঠোর হলেও ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের জন্য ঋণ পুনর্গঠন ও সহায়তার সুযোগ।
- গণমাধ্যমকর্মীদের কল্যাণ: সাংবাদিকদের আবাসন, চিকিৎসা ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ নীতিমালা গ্রহণ।
- মুক্তিযোদ্ধাদের মর্যাদা সংরক্ষণ: মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে রাজনৈতিক বিভাজন না বানিয়ে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদান।
- কৃষি ও কৃষকের সুরক্ষা: সুদমুক্ত বা স্বল্পসুদে কৃষিঋণ, কার্যকর কৃষি বীমা এবং ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ।
উপসংহার:
সংবাদ সম্মেলনের সমাপনী বক্তব্যে বিজেপির পক্ষ থেকে জানানো হয়, জনগণের সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সমতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই তাদের মূল লক্ষ্য। রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলে একটি সুখী ও উন্নত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে তারা দেশের সব স্তরের মানুষের সহযোগিতা কামনা করেন।



0 Comments