শারদীয় দুর্গোৎসবের উৎসবমুখর ও আলোকোজ্জ্বল আবহে রাজধানীর পল্টন ও বিজয়নগর এলাকার দুটি প্রধান পূজামণ্ডপে উৎসবের রং আরও গভীর হয়ে ওঠে। আজ ১৯ অক্টোবর, সোমবার সন্ধ্যায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের সভানেত্রী ও জাতীয় মহিলা সংস্থার চেয়ারম্যান আফরোজা আব্বাস (বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের শীর্ষ নেতা মির্জা আব্বাসের সহধর্মিনী) প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে পূজামণ্ডপ দুটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানগুলোতে অংশগ্রহণ করে তিনি সনাতন ধর্মাবলম্বী অনুসারীদের শারদীয় দুর্গোৎসবের প্রীতি ও শুভেচ্ছা জানান, পূজামণ্ডপ ঘুরে দেখেন এবং আয়োজিত আলোচনা সভায় বক্তব্য প্রদান করেন।
পূজা মণ্ডপগুলোতে প্রদীপ প্রজ্বলন, মোমবাতি প্রজ্জ্বলন এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে কুশল বিনিময়ের মাধ্যমে আফরোজা আব্বাস তার শুভকামনা ব্যক্ত করেন। দুটি পৃথক অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে তিনি বাংলাদেশের বহুজাতিক, বহুধার্মিক ও বহুসাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে সমুন্নত রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, আবহমানকাল ধরে বাংলাদেশে সকল ধর্মের মানুষ পরম সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির পরিবেশে পাশাপাশি বসবাস করে আসছে এবং দুর্গোৎসব কেবল একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের উৎসব নয়; বরং তা সার্বজনীন সম্প্রীতির এক অনন্য মিলনমেলা।
পল্টন কমিউনিটি সেন্টারে প্রথম পূজামণ্ডপ উদ্বোধন ও শুভেচ্ছা বাণী:
সোমবারে নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় আফরোজা আব্বাস রাজধানীর ভিআইপি রোডে অবস্থিত 'পল্টন কমিউনিটি সেন্টার' মণ্ডপে পৌঁছান। পল্টন থানা সার্বজনীন পূজা কমিটির উদ্যোগে এখানে প্রতি বছরের মতো এবারও জাঁকজমকপূর্ণভাবে শারদীয় দুর্গোৎসবের আয়োজন করা হয়।
মণ্ডপে পৌঁছালে পূজা কমিটির সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক এবং স্থানীয় প্রবীণ নেতৃবৃন্দ তাকে ফুল দিয়ে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান। উলুধ্বনি, ঢাকের শব্দ ও ভক্তদের আনন্দঘন পরিবেশে আফরোজা আব্বাস পূজামণ্ডপে প্রবেশ করেন এবং পরম শ্রদ্ধায় দেবী দুর্গার প্রতিমা দর্শন ও আরতিতে অংশগ্রহণ করেন। এরপর তিনি আয়োজকদের সঙ্গে নিয়ে ফিতা কেটে এবং প্রদীপ প্রজ্বলন করে মণ্ডপটির শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করেন।
উদ্বোধনী পর্ব শেষে পল্টন থানা সার্বজনীন পূজা কমিটির উদ্যোগে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে তিনি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য প্রদান করেন।
পল্টন মণ্ডপে আফরোজা আব্বাসের বক্তব্য:
"শারদীয় দুর্গাপূজা শুধু একটি ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান নয়, এটি অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভ শক্তির বিজয়ের এক পরম প্রতীক। মানবজাতির ইতিহাসের প্রতিটি মোড়ে যখনই অন্যায়, অবিচার ও নিপীড়ন ভর করেছে, তখনই দেবী দুর্গার মতো শুভ শক্তির আবাহন ঘটেছে। আজকে আমরা বাংলাদেশে যে সম্প্রীতির আবহ দেখছি, তা একদিনে গড়ে উঠেনি। এটি আমাদের শতাব্দীর পর শতাব্দীর রক্তের মেলবন্ধন এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ফসল।
আবহমানকাল ধরে বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য রূপরেখা বহন করে চলেছে। এখানে ধর্ম যার যার, কিন্তু উৎসব সবার। আমরা শৈশব থেকেই দেখে এসেছি দুর্গাপূজা মানেই শুধু সনাতন ধর্মাবলম্বীদের আনন্দ নয়, প্রতিবেশীর আনন্দ মানে আমাদেরও আনন্দ। বর্তমান প্রেক্ষাপটে আমাদের এই সম্প্রীতিকে আরও জোরদার করতে হবে। কেউ যেন ধর্মীয় অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে বিভেদ সৃষ্টি করতে না পারে, সে বিষয়ে আমাদের সবাইকে সজাগ ও সতর্ক থাকতে হবে।"
আফরোজা আব্বাস আরও বলেন, দেশের প্রতিটি নাগরিকের সমান অধিকার রয়েছে। রাজনীতি বা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে সাধারণ মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাসকে পণ্য বানানোর চেষ্টা অতীতেও সফল হয়নি, ভবিষ্যতেও হবে না। নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা এবং তাদের ধর্মীয় স্বাধীনতাই একটি গণতান্ত্রিক সমাজের প্রধান মাপকাঠি বলে তিনি মন্তব্য করেন।
উক্ত আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন পল্টন থানা সার্বজনীন পূজা কমিটির সভাপতি। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বী সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা। সভা পরিচালনা করেন পূজা কমিটির সাধারণ সম্পাদক।
বিজয়নগরে বাংলাদেশ জাতীয় বধির সংস্থা প্রাঙ্গণে দ্বিতীয় অনুষ্ঠান:
পল্টন কমিউনিটি সেন্টারের অনুষ্ঠান সফলভাবে সম্পন্ন করার পর আফরোজা আব্বাস বিজয়নগরের উদ্দেশ্যে রওনা হন। সন্ধ্যা ৭:০০ টায় তিনি বিজয়নগরের ৬২ নম্বর হোল্ডিংয়ে অবস্থিত 'বাংলাদেশ জাতীয় বধির সংস্থার স্কুল মাঠ প্রাঙ্গণে' পৌঁছান। এখানে পল্টন থানা পূজা পরিষদের ব্যবস্থাপনায় বিশালাকারে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়।
বধির সংস্থার ঐতিহাসিক প্রাঙ্গণে গঠিত এই মণ্ডপটিতে পৌঁছালে তাকে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সাথে বরণ করে নেওয়া হয়। আয়োজক কমিটির সদস্যগণ এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন (বধির) শিক্ষার্থীদের একটি প্রতিনিধি দল তাকে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে স্বাগত জানায়। সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং ধর্মীয় আবেগের সংমিশ্রণে এই স্থানটি এক আবেগঘন ও বর্ণিল আবহে রূপ নেয়।
এখানেও আফরোজা আব্বাস শুভ প্রদীপ প্রজ্বলনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে শারদীয় দুর্গোৎসবের দ্বিতীয় মণ্ডপটি উদ্বোধন করেন। এরপর তিনি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের সাথে সময় কাটান, তাদের খোঁজখবর নেন এবং শারদীয় দুর্গাপূজার শুভেচ্ছা উপহার তুলে দেন।
বিজয়নগর মণ্ডপে আফরোজা আব্বাসের বক্তব্য:
"আজকে বিজয়নগরের এই প্রাঙ্গণে এসে আমার অত্যন্ত আনন্দ হচ্ছে, বিশেষ করে বধির সংস্থার এই শুভ প্রাঙ্গণে আমাদের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ভাই-বোনদের হাসিমুখ দেখে আমার হৃদয় ভরে গেছে। উৎসবের আসল আনন্দ তো সেখানেই, যেখানে সমাজের সকল স্তরের মানুষকে শামিল করা যায়। দুর্গাপূজা আমাদের শেখায় কীভাবে ভেদাভেদ ভুলে সবাইকে বুকে জড়িয়ে নিতে হয়।
নারী সমাজের ক্ষমতায়ন ও অধিকার রক্ষায় আমরা দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে যাচ্ছি। জাতীয় মহিলা সংস্থার মাধ্যমে আমরা বিশ্বাস করি, দেশের প্রতিটি নারী—তিনি যে ধর্মেরই হন না কেন—তার নিরাপত্তা, মর্যাদা ও সাম্য নিশ্চিত করা আমাদের অন্যতম দায়িত্ব। বিশেষ করে সামাজিক ও ধর্মীয় উৎসবে নারীরা যেন কোনো ধরনের ভয়-ভীতি ছাড়া স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করতে পারেন, তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজের যৌথ দায়িত্ব।
আজকের এই পবিত্র সন্ধ্যায় আমি সকল সনাতন ধর্মাবলম্বীদের আহ্বান জানাব, আপনারা অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে সত্য ও ন্যায়ের লড়াই বজায় রাখুন। বাংলাদেশ বিএনপি এবং আমাদের পরিবার সর্বদা আপনাদের পাশে রয়েছে। অতীতেও যেভাবে আপনাদের নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষায় আমরা সোচ্চার ছিলাম, ভবিষ্যতেও সেই আস্থা ও বিশ্বাসের সম্পর্ক অটুট থাকবে।"
বধির সংস্থার প্রাঙ্গণে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে আফরোজা আব্বাসের উপস্থিতি স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা সৃষ্টি করে। উপস্থিত পুণ্যার্থীরা হাততালি ও আনন্দ উল্লাসের মাধ্যমে তার বক্তব্যকে সমর্থন জানান।
উৎসবের আমেজ, সার্বিক নিরাপত্তা ও স্থানীয় প্রতিক্রিয়া:
আফরোজা আব্বাসের এই জোড়া মণ্ডপ পরিদর্শন ও উদ্বোধনকে কেন্দ্র করে পল্টন ও বিজয়নগর এলাকায় উৎসবের তীব্র আমেজ প্রত্যক্ষ করা গেছে। স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিগণ আফরোজা আব্বাসের উপস্থিতিকে অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেন এবং তাকে আন্তরিক ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন।
পল্টন থানা পূজা পরিষদের এক জ্যেষ্ঠ প্রতিনিধি জানান, "আফরোজা আব্বাস মহোদয় প্রতি বছরই আমাদের এই ধর্মীয় উৎসবে অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে যোগ দেন। তার এই আগমন আমাদের উৎসাহ বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। তিনি কেবল একজন রাজনৈতিক বা সামাজিক ব্যক্তিত্ব নন, আমাদের সুদিনের ও দুর্দিনের একজন প্রকৃত সুহৃদ।"
দুই মণ্ডপের অনুষ্ঠানেই উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের একাধিক শীর্ষ নেত্রী, জাতীয় মহিলা সংস্থার কর্মকর্তা, স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মী এবং পূজা উদযাপন পরিষদের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা।
পূজামণ্ডপগুলোর নিরাপত্তায় পুলিশের পাশাপাশি স্থানীয় পূজা কমিটির নিজস্ব স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী এবং নিরাপত্তা বাহিনীর টহল লক্ষ্য করা যায়। অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে এবং ভক্তদের সুষ্ঠু প্রতিমা দর্শনের সুবিধার্থে পুরো এলাকা সিসিটিভি ক্যামেরার আওতাভুক্ত রাখা হয়। অত্যন্ত উৎসবমুখর, আনন্দঘণ ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে দুটি মণ্ডপেরই উদ্বোধনী অনুষ্ঠান সমাপ্ত হয়।
উপসংহার:
শারদীয় দুর্গোৎসবের এই আনন্দঘন সময়ে বিজয়নগর ও পল্টনে আফরোজা আব্বাসের জোড়া পূজামণ্ডপ উদ্বোধন এবং সম্প্রীতির বক্তব্য কেবল উৎসবের আনন্দকেই বাড়ায়নি, বরং বাংলাদেশে বিদ্যমান সাম্প্রদায়িক সৌহার্দ্যের বন্ধনকেও আরও সুদৃঢ় করেছে। ধর্মীয় উৎসবগুলো যে একটি জাতির ঐক্য ও পারস্পরিক ভালোবাসার অনন্য ক্ষেত্র, বিজয়নগর ও পল্টনের ঘটনা তারই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে রইল।

0 Comments