দিনাজপুর শহরের ঐতিহ্যবাহী ঈদগাহ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. ফজলুর রহমানকে রাজকীয় আয়োজনে অশ্রুসিক্ত বিদায় জানিয়েছেন শিক্ষার্থী, প্রাক্তন শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সহকর্মীরা। দীর্ঘ ২০ বছরের কর্মজীবন শেষে বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) অবসরজনিত বিদায়ের এই আবেগঘন আয়োজন পরিণত হয় ভালোবাসা আর স্মৃতিচারণের এক অনন্য মিলনমেলায়।
২০০৬ সালে বিদ্যালয়টিতে যোগদানের পর দীর্ঘ দুই দশক ধরে নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। অবসরের দিন সকালে শিক্ষক যখন বিদ্যালয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন শিক্ষার্থীদের আয়োজন ছিল একদম ভিন্ন। সাজানো ঘোড়ার গাড়ি নিয়ে তারা হাজির হন প্রিয় শিক্ষকের বাসায়। সেখান থেকে রাজকীয়ভাবে ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে বিদ্যালয়ে পৌঁছান প্রধান শিক্ষক ফজলুর রহমান।
বিদ্যালয়ে পৌঁছানোর পর ফুল, ক্রেস্ট, উপহার আর ভালোবাসায় আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি। বিদায়বেলায় শিক্ষার্থীদের চোখেও ছিল অশ্রু। মাইকে বিদায়ী বক্তব্য, স্মৃতিচারণ আর ভালোবাসার প্রকাশে পুরো বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে সৃষ্টি হয় এক আবেগঘন পরিবেশ। একে একে শিক্ষার্থীরা প্রিয় শিক্ষকের কাছে এসে দোয়া নেন, আর বিগত দিনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে অনেকেই অশ্রু ধরে রাখতে পারেননি। শুধু বর্তমান শিক্ষার্থীই নয়, প্রাক্তন অনেক শিক্ষার্থীও ছুটে আসেন প্রিয় শিক্ষককে শেষ বিদায় জানাতে।
কর্মঘণ্টা শেষে আবারও সেই সাজানো ঘোড়ার গাড়িতে করেই প্রিয় শিক্ষককে সসম্মানে তাঁর বাসায় পৌঁছে দেন শিক্ষার্থীরা। এমন ব্যতিক্রমী ভালোবাসা ও সম্মাননা দিনাজপুরে এক বিরল ও অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
বিদায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) এ এস এম হাবিবুল হাসান। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শিক্ষা কর্মকর্তা খন্দকার মো. আলাউদ্দিন আল আজাদ। এ ছাড়া বিদ্যালয়ের সদ্য দায়িত্বপ্রাপ্ত ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক কাফীসহ শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও অন্যান্য আমন্ত্রিত অতিথিরা উপস্থিত ছিলেন।
উল্লেখ্য, শিক্ষকতা ও শিক্ষার্থীদের কল্যাণে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৪ সালে ‘মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কার’-এ সারা দেশের মধ্যে ‘প্রিয় শিক্ষক’ হিসেবে প্রথম স্থান অর্জন করেছিলেন ফজলুর রহমান।
শিক্ষকতার পাশাপাশি সামাজিক উন্নয়নেও তিনি বড় ভূমিকা রেখেছেন। বিশেষ করে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে তাঁর উদ্যোগ প্রশংসনীয়; তাঁর হস্তক্ষেপে একাধিক বাল্যবিবাহ বন্ধ হয়েছে, যার জন্য তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে সম্মাননা লাভ করেছেন। এছাড়া বিদ্যালয়ের মেয়েদের নিয়ে তিনি একটি ফুটবল দল গড়ে তোলেন, যে দল থেকে শতাধিক চ্যাম্পিয়ন ট্রফি অর্জিত হয়েছে এবং এমনকি জাতীয় দলের খেলোয়াড়ও উঠে এসেছে।
দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে শিক্ষার্থীদের শুধু পাঠদানই নয়—স্বপ্ন দেখা, সাহসী হওয়া ও যোগ্যতা বিকাশে নিরন্তন উৎসাহ দিয়ে গেছেন ফজলুর রহমান। কর্মজীবনের শেষ দিনে শিক্ষার্থীদের এমন বিরল ভালোবাসা ও রাজকীয় বিদায় তাঁর দীর্ঘ পথচলার এক স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকবে।




0 Comments