রাজশাহী মহানগরীর সাহেব বাজার এলাকায় সেনাবাহিনীর সৈনিক পরিচয় দিয়ে জাল নোটের মাধ্যমে অভিনব কায়দায় স্বর্ণের চেইন প্রতারণার অভিযোগে দুই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে বোয়ালিয়া মডেল থানা পুলিশ। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা ও এসআরবি-১ (উত্তরা, ঢাকা)-এর যৌথ সহযোগিতায় এই অভিযান পরিচালিত হয়।
গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন—নিজেকে সেনাসদস্য হিসেবে পরিচয় দেওয়া মূল অভিযুক্ত মোঃ রিয়াজুল ইসলাম এবং চোরাই স্বর্ণালংকার ক্রেতা ও ঢাকার খিলক্ষেতের ‘মা জুয়েলার্স’-এর মালিক মোঃ রোমান। অভিযানে রাজশাহী ও বগুড়ায় প্রতারণার মাধ্যমে আত্মসাৎকৃত দুটি স্বর্ণের চেইন, একটি মোবাইল ফোন এবং নগদ ১৪ হাজার ৯৭২ টাকা উদ্ধার করেছে পুলিশ।
যেভাবে ঘটেছিল প্রতারণা
পুলিশ ও ভুক্তভোগী সূত্রে জানা যায়, রাজশাহী মহানগরীর সাহেববাজার ‘আশা জুয়েলারি স্টোর’-এর মালিক মোঃ রাসেদুল ইসলাম ও তাঁর বাবা দীর্ঘদিন ধরে সুনামের সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছেন। গত ২৪ সেপ্টেম্বর বিকেল পৌনে ছয়টার দিকে এক ব্যক্তি দোকানে এসে নিজেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন সৈনিক পরিচয় দেন।
তিনি জানান, তাঁর 'মেজর স্যারের' মেয়ের বিয়ে উপলক্ষে স্বর্ণের গহনা কিনতে হবে। প্রথমে তিনি ৭০০ টাকা দিয়ে একটি নাকফুল কেনেন এবং আট আনা ওজনের একটি স্বর্ণের চেইন পছন্দ করে জানান যে, পরবর্তীতে টাকা পরিশোধ করে সেটি নিয়ে যাবেন।
পরিকল্পিত ধারাবাহিকতায় গত ২৭ সেপ্টেম্বর সকাল পৌনে ১১টার দিকে ওই ব্যক্তি পুনরায় দোকানে এসে সেই স্বর্ণের চেইনটি নিতে চান। দোকানে ওই মাপে চেইন প্রস্তুত না থাকায় পাশেই থাকা ‘বিশ্বনাথ জুয়েলার্স’ থেকে ২২ ক্যারেটের আট আনা এক পয়েন্ট ওজনের একটি স্বর্ণের চেইন এনে তাঁকে দেওয়া হয়, যার তৎকালীন বাজারমূল্য ছিল ১ লাখ ১৫ হাজার টাকা।
চেইনটি হাতে নিয়ে প্রতারক ব্যক্তি ১ হাজার টাকা মূল্যমানের ১১৫টি নতুন নোট পরিশোধ করেন। দোকান মালিকের বাবা নোটগুলো যাচাই করতে পাশের অন্য একটি দোকানে গেলে সেগুলো জাল বলে শনাক্ত হয়। কিন্তু দোকান থেকে ফিরে এসে মালিকপক্ষ দেখতে পান প্রতারক ততক্ষণে চম্পট দিয়েছেন। এভাবে ১ লাখ ১৫ হাজার টাকার জাল নোট গচিয়ে স্বর্ণের চেইনটি হাতিয়ে নেওয়া হয়।
তথ্যপ্রযুক্তি ও সিসি ফুটেজ বিশ্লেষণে সাফল্য
এ ঘটনায় থানায় মামলা দায়েরের পর রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের (আরএমপি) কমিশনার মোহাম্মদ ফয়েজুল কবির পিপিএম-এর নির্দেশনায় বোয়ালিয়া মডেল থানা পুলিশ ছায়াতদন্ত শুরু করে। তথ্যপ্রযুক্তি এবং আরএমপির সিসি ক্যামেরা টিমের সহায়তায় বিভিন্ন পয়েন্টের সিসি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে আসামির সুনির্দিষ্ট গতিবিধি শনাক্ত করা হয়।
এরই ধারাবাহিকতায় গত ১৩ অক্টোবর সকাল সাড়ে নয়টার দিকে ঢাকার খিলক্ষেত থানাধীন জামতলা মোড় এলাকা থেকে মূল অভিযুক্ত মোঃ রিয়াজুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারকৃত রিয়াজুল ঝালকাঠি জেলার সদর থানাধীন উত্তর মারাবাটি গ্রামের হারুন অর রশীদের ছেলে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ডিএমপির খিলক্ষেত থানাধীন টানপাড়া এলাকায় বসবাস করছিলেন।
জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য ও বগুড়ার ঘটনা
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে রিয়াজুল স্বীকার করেন যে, প্রতারণার মাধ্যমে আত্মসাৎ করা স্বর্ণের চেইনটি তিনি খিলক্ষেতের ‘মা জুয়েলার্স’-এর মালিক মোঃ রোমানের কাছে বিক্রি করেছেন। রোমানের বাড়ি কুমিল্লা জেলার বুড়িচং থানাধীন লড়িবাগ গ্রামে, তাঁর বাবার নাম আলফু মিয়া।
রিয়াজুলের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে একই দিন বেলা সাড়ে ১২টার দিকে ‘মা জুয়েলার্স’-এ অভিযান চালিয়ে দোকান মালিক রোমানকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় তাঁর হেফাজত থেকে রাজশাহীর ‘আশা জুয়েলারি স্টোর’ থেকে আত্মসাৎ করা স্বর্ণের চেইনটি উদ্ধার করা হয়।
পুলিশের তদন্তে আরও জানা যায়, গ্রেপ্তারকৃত রিয়াজুল একই কৌশলে গত ৬ অক্টোবর বগুড়ার নিউ মার্কেটের স্বর্ণপট্টিতে অবস্থিত ‘তামান্না জুয়েলার্স’ থেকেও ১ লাখ ২২ হাজার টাকার জাল নোট দিয়ে আট আনা তিন রতি তিন পয়েন্ট ওজনের আরও একটি স্বর্ণের চেইন আত্মসাৎ করেছিলেন। বোয়ালিয়া মডেল থানা পুলিশ বগুড়ায় আত্মসাৎ করা ওই চেইনটিও উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে।
প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, রিয়াজুল ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে দেশের বিভিন্ন স্থানে একই কৌশলে প্রতারণা চালিয়ে আসছেন। ইতিপূর্বে রংপুর জেলার বদরগঞ্জ থানা এবং ডিএমপির খিলক্ষেত থানায় বিশেষ ক্ষমতা আইনে তাঁর বিরুদ্ধে দুটি মামলা রয়েছে।
এ বিষয়ে রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের (আরএমপি) সিটিটিসি-র ভারপ্রাপ্ত ও মিডিয়া উইংয়ের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) গাজিউর রহমান জানান, গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া বর্তমানে চলমান রয়েছে।
#RajshahiNews #CrimeNews #FakeCurrency #GoldTheist #BangladeshPolice #RMP #CrimeUpdate #BreakingNewsRajshahi



0 Comments