ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দখল, ধারাবাহিক হামলা, মারধর, হুমকি, অপহরণ, বিবস্ত্র করে ভিডিও ধারণ এবং নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তার দাবিতে আমরণ অনশন কর্মসূচি পালন করছেন ফেনীর সাদ্দাম হোসাইন. দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে রাজনৈতিক হয়রানি ও নিপীড়নের শিকার হয়ে এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ জানিয়েও কার্যকর সমাধান না পেয়ে তিনি বাধ্য হয়ে এই পথ বেছে নিয়েছেন বলে প্রেস রিলিজে উল্লেখ করেছেন.
পটভূমি ও জুলাই গণঅভ্যুত্থান:
সাদ্দাম হোসাইন জানান, রাজনৈতিক হয়রানির শিকার হয়ে এ পর্যন্ত তাঁর বিরুদ্ধে আটটি মামলা হয়েছে এবং তাঁকে চারবার কারাবরণ করতে হয়েছে. ডিবি হেফাজতে নির্যাতনের শিকার হওয়ার পাশাপাশি পল্টন থানার সাত দিনের রিমান্ড চাওয়ার খবর শুনে তাঁর বাবা হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান, এমনকি তিনি বাবার জানাজায়ও অংশ নিতে পারেননি. ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ঢাকার যাত্রাবাড়ী এলাকায় সামনের সারিতে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন তিনি এবং তাঁর দেওয়া কিছু স্লোগান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল. গণঅভ্যুত্থানের পর কোনো রাজনৈতিক বা সাংগঠনিক আর্থিক সুবিধা না নিয়ে তিনি নিজের পুঁজিতে জীবিকা গড়ার চেষ্টা করেন.
ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা ও চাঁদা দাবি:
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর নিজের সঞ্চয়, স্ত্রীর গয়না এবং আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের সহায়তায় ফেনীতে 'উৎসব কাবাব এন্ড রেস্টুরেন্ট' ও 'হোটেল পানশী ফেনী' প্রতিষ্ঠা করেন সাদ্দাম হোসাইন. প্রতিষ্ঠার কিছুদিন পর একটি চক্র ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে এবং চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাঁকে ব্যবসা ছেড়ে দেওয়ার হুমকি দেয়.
গত ২০২৫ সালের ২৩ অক্টোবর ১৫-২০ জনের একটি দল তাঁর প্রতিষ্ঠানে হামলা ও ভাঙচুর চালায় এবং রাত ২টা পর্যন্ত ব্যবসায়িক অংশীদার ও কর্মচারীদের জিম্মি করে নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প ও চেক ছিনিয়ে নেয় বলে অভিযোগ করা হয়. এ ঘটনায় সিআইডি তদন্তে অপু কুমার কর প্রকাশ অর্ক, রেজাউল করিম প্রকাশ রিদয়ান, সরোয়ার জাহান প্রকাশ রাজু, তন্ময় দাশ, শামীম কাউছার প্রকাশ প্রভাত এবং আমজাদসহ সাতজনের বিরুদ্ধে প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে.
অপহরণ ও ভিডিও ধারণের অভিযোগ:
চলতি বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি রমজান মাসে তাঁকে অপহরণ করে একটি নির্জন স্থানে নিয়ে মারধর, দাড়ি ধরে টানা, মুখে জুতা ঘষা এবং জোর করে নাচানোর ভিডিও ধারণ করা হয়. এছাড়া বিবস্ত্র করে ভিডিও ধারণ ও মামলা প্রত্যাহারে চাপের অভিযোগও তুলেছেন তিনি. জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ ফোন করার পর পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করলেও থানায় আটকে রেখে মামলা করার চাপ দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন সাদ্দাম. এই ঘটনায় ফেনী জি.আর মামলা নং ১৬৮/২৬ চলমান রয়েছে এবং এতে জেলা ছাত্রদল নেতা রশিদ আহম্মদ মজুমদার, নেছার উদ্দিন বাপ্পি, জুনায়েদ রাব্বানি রিজন ও অমিত আরজুনসহ ১০-১৫ জন জড়িত বলে উল্লেখ করা হয়েছে.
রেস্টুরেন্ট লুট ও পরবর্তী হামলাসমূহ:
গত ২৭ ফেব্রুয়ারি ফেনী-০২ আসনের এমপির পরিচয়ে জাফর আহমেদের নেতৃত্বে রেস্টুরেন্টে হামলা ও মালামাল লুট করা হয়. রেস্টুরেন্ট দখল ও বন্ধ থাকায় তাঁর প্রায় ৪০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে এবং পিবিআইয়ের তদন্ত প্রতিবেদনের কিছু বিষয়ে নারাজি দিয়ে তিনি আদালতে আবেদন করেছেন.
পরবর্তীতে ৩ জুন ফেনী মডেল থানার সামনে, ৩ আগস্ট আদালত প্রাঙ্গণ ও পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের সামনে এবং ৩ সেপ্টেম্বর আদালতে হাজিরা দিতে যাওয়ার সময়ও একাধিকবার তাঁর ওপর হামলা চালানো হয়. এসব ঘটনায় তিনি একাধিক মামলা দায়ের করেছেন, যার কিছু মামলার তদন্ত প্রতিবেদন পিবিআই দাখিল করেছে.
চরম আর্থিক সংকট ও আইনি সহায়তা:
আইনি লড়াই চালাতে গিয়ে সংসারের খাট, আলমারি, তোশক, ফ্যান ও স্ত্রীর কানের দুলসহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বিক্রি করে দিয়েছেন সাদ্দাম হোসাইন. গত এক বছর ধরে অসুস্থ মায়ের চিকিৎসা ও পরিবারের ভরণপোষণ চালাতে না পেরে তিনি চরম মানবেতর জীবনযাপন করছেন. পরবর্তীতে অ্যাডভোকেট আবদুল আহাদ ভূঁইয়া ও অ্যাডভোকেট আবুল হাসান বিনা পারিশ্রমিকে তাঁর মামলা পরিচালনা করছেন.
সাদ্দাম হোসাইনের ৭ দফা দাবি:
১. দখলকৃত রেস্টুরেন্ট আইনানুগভাবে উদ্ধার করে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণসহ বুঝিয়ে দেওয়া।
২. দায়েরকৃত ও সংশ্লিষ্ট সব হামলা-মামলার সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা।
3. জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ।
৪. ফেনী শহর ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক জাফর আহমেদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্ত এবং বর্তমান কমিটির বৈধতা যাচাই করা।
৫. দায়িত্বে অবহেলা বা অসদাচরণের অভিযোগে অভিযুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত ও ব্যবস্থা নেওয়া।
৬. অভিযুক্ত রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট দলের বিধি অনুযায়ী সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া।
৭. সাদ্দাম হোসাইন, তাঁর ব্যবসায়িক অংশীদার ও পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী, আইজিপিসহ বিভিন্ন পর্যায়ের ৬৭ জন ব্যক্তি ও কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করেও প্রতিকার না পেয়ে তিনি এই আমরণ অনশন কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন বলে প্রেস রিলিজে জানানো হয়েছে। তিনি কারও প্রতি প্রতিশোধ চান না, কেবল নিজের ন্যায্য অধিকার, জীবিকা এবং নিরাপত্তা চান।





0 Comments